ত্রিশঙ্কু
দক্ষিণ গোলার্ধের সুবিখ্যাত ও সবচেয়ে ছোট তারামণ্ডল হলো ক্রাক্স (Crux)। এটা দক্ষিণ গোলার্ধের গুরুত্বপূর্ণ একটা তারামণ্ডল কারণ, উত্তর গোলার্ধে উত্তর মেরু চেনার জন্য ধ্রুবতারা থাকলেও দক্ষিণ গোলার্ধে এমন কোনো তারা নেই৷ কিন্তু এই তারামণ্ডলটা ব্যবহার করে ধ্রুব তারার মতো সুবিধা পাওয়া যায় দক্ষিণ গোলার্ধে। এই তারামণ্ডলটি এতো বিখ্যাত যে, দক্ষিণ গোলার্ধের অনেক দেশের জাতীয় ও প্রাদেশিক পতাকা সহ উত্তর গোলার্ধেরও অনেক পতাকা এবং মনোগ্রামে এটি জায়গা করে নিয়েছে। এই Crux তারামণ্ডলকে বাংলায় বলা হয় ত্রিশঙ্কু। আর এই তারামণ্ডলের সাথে বাংলা প্রবাদ ‘ত্রিশঙ্কু অবস্থা’ জড়িত।
এখন এই ত্রিশঙ্কু অবস্থার পেছনের পুরাণ বা গল্পটা জানা যাক। ত্রিশঙ্কু ছিলেন একজন সূর্যবংশীয় রাজা। তিনি চাইতেন সশরীরে স্বর্গে যাবেন। আর এ উদ্দেশ্যে তিনি যজ্ঞ করতে চান। এজন্য তিনি বশিষ্ঠ ঋষিকে অনুরোধ করেন। কিন্তু বশিষ্ঠ এতে অসম্মতি জানান। কারণ মৃত্যু বাদে কারো পক্ষেই স্বর্গে যাওয়া সম্ভব নয়। এখন এই যুগে ঋষি-পণ্ডিতদের মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও রেষারেষি ছিলো। কোনো কোনো মুনি ছিলেন অভিজাত দেবতাদের পছন্দের আবার কেউ কেউ ছিলেন অপছন্দের। মুনি অর্থাৎ ঋষি বা জ্ঞানী বুদ্ধিজীবীদের ভয়ে দেবতারাও ভীত হয়ে ক্ষমতার ভারসাম্য বজায় রাখার চেষ্টা করতেন। কোনো কোনো জ্ঞানীর ক্ষমতা দেবতার শক্তিকেও চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম ছিল।
বশিষ্ঠের সাথে রেষারেষি ছিলো বিশ্বামিত্রের। বশিষ্ঠ যজ্ঞ করবে না শুনে এগিয়ে এলেন তিনি। ত্রিশঙ্কুকে জানালেন যে এই যজ্ঞ পরিচালনায় তিনি ইচ্ছুক এবং স্বীয় তেজবলে ত্রিশঙ্কুকে তিনি স্বর্গে পাঠাতে পারবেন। যজ্ঞ শুরু হলে তিনি আপন ক্ষমতায় রাজাকে তিনি স্বর্গারোহণে পাঠান। কিন্তু সশরীরে স্বর্গে আসছেন দেখে দেবরাজ ইন্দ্র ভীষণ রেগে যান এবং তাঁকে পৃথিবীতে ফেরত পাঠাতে থাকেন। এবারে বিশ্বামিত্র ত্রিশঙ্কুর এই মর্ত্যে নেমে আসা থামিয়ে দিলে রাজা ত্রিশঙ্কু স্বর্গ-মর্ত্যের মাঝপথে উল্টো অবস্থায় (মাটির দিকে মাথা দিয়ে) আটকা পড়ে যান। এই ঘটনা থেকেই বাংলা বাগধারা "ত্রিশঙ্কু অবস্থা" এসেছে।
নিজের গৌরব রক্ষা করতে বিশ্বামিত্র ত্রিশঙ্কুকে শূন্যে ভাসমান রাখেন এবং এ অবস্থাতেই ভিন্ন একটি ব্রহ্মান্ড বা নক্ষত্রমণ্ডল সৃষ্টিতে নিযুক্ত হন। তাঁর উদ্দেশ্য ছিল নিজের তৈরি ব্রহ্মান্ডে ত্রিশঙ্কুকে উঠিয়ে নিলে কারো পক্ষে বাধা দেয়া যেমন সম্ভব হবে না তেমনি তাঁর নিজের সম্মানও রক্ষা পাবে। নক্ষত্রমণ্ডল তৈরির পর বিশ্বামিত্র তার সৃষ্ট জগতে নতুন দেবতা ও নতুন ইন্দ্রের সৃষ্টিতে তৎপর হলেন। বিশ্বামিত্রের এই কাজে ভীত হয়ে দেবতারা নতি স্বীকার করে মেনে নিলেন যে, তার সৃষ্ট আকাশে নক্ষত্রমণ্ডল থাকবে এবং সেখানে ত্রিশঙ্কুও দেবতুল্য হয়ে অবস্থান করবেন। এই সৃষ্ট নক্ষত্রমণ্ডলটিই হলো আমাদের Crux বা ত্রিশঙ্কু।
এই যে ত্রিশঙ্কু স্বর্গে বা মর্ত্যে কোথাও অবস্থিত না হয়ে মাঝ আকাশে অবস্থিত হয়েছেন দেবতা এবং ঋষিদের দ্বন্দ্বের শিকার হয়ে। আমাদের সমাজে উভয় সঙ্কটে পড়ে অনিশ্চিত অবস্থায় থাকার বিষয়টি এভাবেই ত্রিশঙ্কুর অবস্থার সাথে তুলনীয় হয়ে প্রবাদে পরিণত হয়েছে।
তথ্যসূত্র:
১. সমর পাল, প্রবাদের উৎসসন্ধান, শোভা প্রকাশ (২০২১)
২. শাহনাজ পান্না, পুরাণ ও জ্যোতির্বিজ্ঞান, বাতিঘর প্রকাশনী (২০২০)



