ওষুধ নিয়ে জনগণকে বোকা বানানোর একটি মার্কেটিং গিমিক
সন্ধ্যায় ফ্যামিলির সাথে বসে চা খাচ্ছিলাম।
বাবা বলে উঠলেন, ‘আমি এলার্জির জন্য অনলাইনে ওষুধ অর্ডার করেছি।’
আমি বললাম, ‘কাদের কি ওষুধ?’
বাবা বললেন, ‘ডাক্তার X* এর ওষুধ’।
আমি বললাম, ‘ডাক্তার X একজন ডাক্তার, ওষুধ বানানো উনার কাজ নয়। শুধু তাই না, কোনো ওষুধ গবেষণার পর, ক্লিনিক্যাল ট্রায়ালের পর একদম সব অনুমোদন শেষে মাস লেভেলে জনসাধারণের জন্য প্রোডাকশন শুরু না হওয়া পর্যন্ত স্বাভাবিকভাবে কোনো ওষুধ তিনি সাজেশন দেয়ার অবস্থান রাখেন না। সেখানে কিসের এলার্জির ওষুধ বিক্রি করছেন উনি?’
বাবা বললেন, ‘আমি তো অনুমতির সার্টিফিকেট দেখেছি।’ আমি বললাম, ‘দেখাও দেখি’।
পরে ঘেটেঘুটে বের করে জুম করে দেখলাম— এটা একটা microbiological test report। আর এই রিপোর্ট দেখিয়ে ওয়েবসাইটে লেখা— BCSIR - কতৃক পরিক্ষিত (BCSIR যেহেতু সরকারি একটা প্রতিষ্ঠান সুতরাং এখানে সরকারি লগো থাকাটা স্বাভাবিক।)
বাবাকে তারপর বললাম, ‘তুমি জানোও না রিপোর্টটা আসলে কিসের। এদিকে আসো। এগুলো কি একটু পড়ো।’
বাবা পড়তে শুরু করলো, ‘Bacillus cereus, Salmonella spp..’
আমি থামিয়ে বললাম, ‘এগুলো কি জানো?’ বাবা বললো, ‘না’। আমি বললাম, ‘এগুলো ব্যাকটেরিয়া আর এটা ওষুধের বিক্রির অনুমোদন কিংবা ওষুধের কার্যকারিতার পরীক্ষিত রিপোর্ট নয়, এটা শুধুমাত্র এখানে ক্ষতিকর মাইক্রো অর্গানিজম বা অণুজীব নেই এটা বলা হয়েছে। তুমি যদি শুধুমাত্র রিপোর্টের কমেন্টটাও দেখো তাহলে দেখো লেখা আছে— 'the above microbiological test were found in the supplied sample'’
জি, এই রিপোর্ট ওষুধের বিক্রির অনুমোদন কিংবা ওষুধের কার্যকারিতার পরীক্ষিত রিপোর্ট নয়। কিন্তু আমাদের জনসাধারণ এগুলো বুঝবে না স্বাভাবিকভাবেই, কিন্তু তাও এটা দেখিয়ে জনগণকে বোকা বানিয়ে এই ওয়েবসাইটে এই প্রোডাক্ট বিক্রি করা হচ্ছে। আর জনসাধারণ না বুঝেই অনুমোদিত কিংবা কার্যকর এমন ভেবে এই মার্কেটিং গিমিকের ফাঁদে পা দিচ্ছে।
কোনো একটা প্রোডাক্টের মাইক্রোবায়োলজি টেস্ট এটা প্রমাণ করে না যে— এটা কোনো একটা বিষয়ে কার্যকর। এই টেস্টের কাজ শুধুমাত্র এটা দেখানো যে এখানে ওমুক মাইক্রো অর্গানিজম বা অণুজীব আছে না-কি নেই কিংবা থাকলেও কি পরিমাণে আছে।
যেমন ধরা যাক আমি একটা ভালো জীবাণুমুক্ত সোর্স থেকে পানি সংগ্রহ করলাম। তারপর পানিকে এই মাইক্রোবায়োলজি টেস্ট করলাম আর দেখালাম এটা সেইফ। তারমানে কি আমি দাবি করবো— এই বিশেষ পানিটা খেলে আপনার এলার্জি, ক্যান্সার সহ জগতের সকল রোগ ভালো হয়ে যাবে? অবশ্যই না! কিন্তু এখানে টেকনিক্যালি এটাই করা হয়েছে আর জনগণকে ধোকা দেয়া হচ্ছে।
জনপ্রিয়তা বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের শুধুমাত্র মাইক্রোবায়োলজির একটা বৈজ্ঞানিক রিপোর্ট দেখিয়ে এভাবে জনসাধারণের নিকট পণ্য বিক্রি করা অত্যন্ত বিভ্রান্তিকর এবং অনৈতিক একটি মার্কেটিং কৌশল। আশাকরি জনগণ যেনো এই ফাঁদে পা না দেয়।
*Dr. X = এখানে যেকোনো ফেমাস ডাক্তার, কিংবা গবেষককেও বসাতে পারেন। বিদেশে অনেক ফেমাস গবেষকদেরও অনেক ওষুধ কোম্পানি তাদের প্রোডাক্ট প্রোমোশন করতে কনভিন্স করে যেগুলো জনসাধারণের জন্য ম্যাস লেভেলে আসে নি কিংবা এখনো ট্রায়ালে আছে। যদিও ইউরোপের দিকে এসবের সংখ্যা খুবই কম। জনগণের মাথায় রাখা উচিত একজন প্র্যাকটিস করা ডাক্তার কয়েকটি স্টেপ এবং অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে আপনার জন্য যে ওষুধ খাটতে পারে সেটা দিবেন। সুতরাং অনলাইনের এসব ফাঁদে না পড়ে আপনার অসুস্থতার জন্য সঠিক ডাক্তারকে দেখান।



