ফটোসিন্থেসিস ও প্রোডাক্টিভিটি
আমরা জীবনে অনেকসময় ভুল জায়গাটায় উন্নতি ঘটানোর চেষ্টা করি। এই ধরা যাক— বেশি কাজ করি, নতুন কোর্স কিনি, প্রোডাক্টিভিটি অ্যাপ ডাউনলোড করি। এর পরেও দেখা যায় খুব একটা লাভ হয়নি। কিন্তু কেন?
এটার একটা ব্যখ্যা জীববিজ্ঞানের উদ্ভিদ শারীরতত্ত্বের একটা কনসেপ্ট তথা লিমিটিং ফ্যাক্টর বা সীমাবদ্ধতা ফ্যাক্টরের মাধ্যমে দেয়া যেতে পারে। ফটোসিন্থেসিস বা সালোকসংশ্লেষণ দিয়ে আমরা বিষয়টা একটু বোঝার চেষ্টা করতে পারি।
সালোকসংশ্লেষণ নিয়ে কমবেশি সকলেরই ছোটবেলায় পড়া হয়েছে। সহজ ভাষায়— “যে জৈব রাসায়নিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সবুজ উদ্ভিদ কোষে সূর্যালোকের উপস্থিতিতে, পরিবেশের বায়ুমণ্ডল থেকে গৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইড (CO₂) ও মূল দ্বারা শোষিত জলের বিক্রিয়ায় শর্করা জাতীয় খাদ্যের সংশ্লেষ ঘটে এবং গৃহীত কার্বন ডাইঅক্সাইডের সমপরিমাণ অক্সিজেন (O₂) প্রকৃতিতে নির্গত হয়, তাকে সালোকসংশ্লেষণ বলে।” (উইকিপিডিয়া)। আর লিমিটিং ফ্যাক্টর হলো— “যদি একটি শারীরবিজ্ঞানিক প্রক্রিয়া একাধিক ফ্যাক্টর দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয় তবে সবচেয়ে ধীর গতিসম্পন্ন ফ্যাক্টর (সর্বনিম্ন ফ্যাক্টর) দ্বারাই শারীরবিজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার হার নিয়ন্ত্রিত হবে যাকে লিমিটিং ফ্যাক্টর বলে।”
“১৯০৫ সালে ব্ল্যাকম্যান (Blackman, 1905) 'ল অব মিনিমাম' (Law of minimum) এর উপর ভিত্তি করে 'ল অব লিমিটিং ফ্যাক্টর সূত্র' (Law of limiting factor) বা 'সীমাবদ্ধতা ফ্যাক্টর সূত্র' প্রস্তাব করেন। এ সূত্র অনুযায়ী যখন কোনো শারীরবিজ্ঞানিক প্রক্রিয়ার দ্রুততা (rapidity) কয়েকটি পৃথক ফ্যাক্টর দ্বারা প্রভাবিত হয় সে ক্ষেত্রে নিম্নতম গতিসম্পন্ন ফ্যাক্টর দ্বারাই এ প্রক্রিয়ার গতি সীমাবদ্ধ হবে। ব্ল্যাকম্যানের ভাষায় "When a process is conditioned as to its rapidity by a number of seperate factors, the rate of the process is limited by the pace of the slowest factor। সালোকসংশ্লেষণ প্রক্রিয়ায় তাপমাত্রা, আলোর তীব্রতা এবং CO₂ এর ঘনত্ব এই তিনটি লিমিটিং ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করে। লিমিটিং ফ্যাক্টরের নীতি অনুযায়ী সালোকসংশ্লেষণ যে কোনো নির্দিষ্ট সময়ে শুধুমাত্র একটি ফ্যাক্টর দ্বারা সীমাবদ্ধ হয়। সালোকসংশ্লেষণের হার ঐ নির্দিষ্ট ফ্যাক্টরের সমানুপাতিক (proportional) অর্থাৎ ফ্যাক্টরটির পরিমাণ বাড়লে সালোকসংশ্লেষণের হারও বাড়বে।” (আবুল হাসান, জীববিজ্ঞান ১ম পত্র)।
এখন, সালোকসংশ্লেষণের সাথে লিমিটিং ফ্যাক্টরের সম্পর্কটা যদি একটু ঘেটে দেখি— ধরা যাক, গাছের অভাব পড়েছে কার্বন ডাইঅক্সাইডের। কিন্তু আপনি দিচ্ছেন পানি। এতে সালোকসংশ্লেষণের হার বাড়বে না। আবার গাছের দরকার সূর্যের আলো আপনি ব্যবস্থা করলেন কার্বন ডাইঅক্সাইডের। এতেও কোনো লাভ হবে না। অর্থাৎ যে ফ্যাক্টরটা লিমিটিং হিসেবে কাজ করছে, সেটি বাদে আপনি অন্যান্য সবকিছু বাড়ালেও সালোকসংশ্লেষণের হার বাড়বে না বা কোনো ফল পাওয়া যাবে না। আবার একটা লিমিটিং ফ্যাক্টর ঠিক করার পর অন্য একটা নতুন লিমিটিং ফ্যাক্টর হয়ে যেতে পারে।
এবার প্রোডাক্টিভিটির দিকে তাকানো যাক। আমাদের প্রোডাক্টিভিটি বা গ্রোথ ডিপেন্ড করে দুই ধরনের লিমিটিং ফ্যাক্টরের ওপর। একটার ওপর আমাদের কন্ট্রোল আছে। অন্যটার ওপর নেই। কন্ট্রোল নেই এমন একটা ফ্যাক্টর হলো জেনেটিক্স। ফলে এসব ফ্যাক্টর হিসেবে বাইরে। কিন্তু কন্ট্রোল করা যায় এমন ফ্যাক্টর; যেমন— আমাদের প্রতিদিনের কাজ কিংবা ওভার-অল লাইফস্টাইল; এসবের মধ্যে বিদ্যমান লিমিটিং ফ্যাক্টর হবে আমাদের দেখার কিংবা ভাবার বিষয়।
প্রোডাক্টিভ বা পার্সোনাল গ্রোথের জন্য এক্ষেত্রে কন্ট্রোল করা যায় এমন লিমিটিং ফ্যাক্টরটাকে ঠিকঠাক ভাবে খুঁজে বের করাই আসলে প্রথম মূল লক্ষ্য। কেননা, সঠিক ফ্যাক্টরটাকে শোধরাতে পারলেই গ্রোথের হার বেড়ে যাবে। বিষয়টা একটা উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যাক— ধরা যাক, আপনি সারাদিন অনেক টায়ার্ড থাকেন। আপনি জানেন যে, শক্তি কম থাকলে বেশি টায়ার্ড লাগে। তো আপনি ঠিক করলেন— আপনি যদি খাওয়া-দাওয়ার মাত্রা বাড়িয়ে দেন, তাহলে বেশি শক্তি পাবেন এবং আপনার টায়ার্ডনেস চলে যাবে। অনেকে আবার এই সমস্যার সমাধানে মাতব্বরি করে সাপ্লিমেন্ট খাওয়াও শুরু করতে পারে! কিন্তু এক্ষেত্রে আপনাকে বুঝতে হবে যে, এই শক্তির লিমিটিং ফ্যাক্টর মোটাদাগে ৩টা ভাগে বিভক্ত*। যথা: ১. খাদ্যাভ্যাস ২. ঘুম ৩. ম্যান্টাল হেলথ্। আর আপনি হচ্ছে গিয়ে ঘুমান মাত্র ৩-৪ ঘণ্টা। এক্ষেত্রে আপনার টায়ার্ডনেস এর মূল লিমিটিং ফ্যাক্টর হলো ঘুম। বেশি খাওয়া-দাওয়া করে এই সমস্যার সমাধান করা সম্ভব নয়। বরং স্লিপ সাইকেল ঠিক করলেই সমস্যা শেষ।
এখন ধরা যাক, আপনি ঘুমের বিষয়টা ঠিক করে ফেললেন। ওদিকে খাদ্যাভ্যাসও আগে থেকে ঠিকঠাক। কিন্তু ম্যান্টাল হেলথ্ ঠিক অতোটা ঠিক নেই যতটা থাকতে পারে বা থাকা উচিত। অর্থাৎ এখানে ইম্প্রুভ করার জায়গায় আছে। সুতরাং এই শক্তির ক্ষেত্রে এটা হয়ে গেলো নতুন একটা লিমিটিং ফ্যাক্টর। এখন আপনার কাজ হবে এই ফ্যাক্টরটাকে ঠিক করা এবং তার জন্য যে ব্যবস্থা নিতে হবে সেটা নেয়া।
আবার, এখানে শক্তি ছিলো আমাদের ওভার-অল লাইফস্টাইলের ১টা মাত্র ফ্যাক্টর, একমাত্র নয়। সুতরাং এটা ঠিক করার পর আপনি দেখলেন যে— টায়ার্ড তো হচ্ছি না, কিন্তু দৈনন্দিন জীবনের কাজ ঠিকঠাক মতো সব শেষ হচ্ছে না। এক্ষেত্রে আগে হয়তো শক্তি ছিলো লিমিটিং ফ্যাক্টর, কিন্তু এখন টাইম ম্যানেজমেন্ট হলো নতুন আরেকটা লিমিটিং ফ্যাক্টর। এখন এটাকে ঠিক করতে হবে টাইম ম্যানেজমেন্ট এর জন্য যা প্রযোজ্য তার সাহায্য নিয়ে।
তো মোটাদাগে বলা যায় এটা হলো একটা লুপের মতো। প্রথমে সঠিক লিমিটিং ফ্যাক্টর ধরা। তারপর সে অনুযায়ী পদক্ষেপ নেয়া। পরিশেষে সমস্যার সমাধান করা বা ইম্প্রুভ করা। এভাবে ধীরে ধীরে ওভার-অল লাইফস্টাইল ইম্প্রুভ হবে বা গ্রোথ হবে নিজেদের জীবনে। এক্ষেত্রে “কিভাবে আরো বেশি প্রোডাক্টিভ হওয়া যায় বা গ্রোথ এচিভ করা যায়?” এই চিন্তা না করে, “কোন কাজ বা বিষয়টা আমার গ্রোথ বা প্রোডাক্টিভিটিকে লিমিট করে ফেলছে?” এই প্রশ্ন করাটা হয়তো উপকারী। পড়াশোনা, কর্মক্ষেত্র, ব্যবসা সবক্ষেত্রেই বা সকল সিস্টেমেই আসলে এই প্রিন্সিপ্যালটা খাটে।
এখন আপনার কাজ হলো— বর্তমানে আপনার লিমিটিং ফ্যাক্টর কি সেটা সঠিকভাবে খুঁজে বের করা এবং তার যথাযথ সমাধান করা।
পাদটীকা:
*ফ্যাক্টর অনেক আছে, অনেক টাইপের আছে। এখানে বোঝানোর সুবিধার্থে ৩টা ভাগে ভাগ করলাম।


