নোটস ফ্রম ‘দ্য ডায়রি অফ অ্যা সিইও’ ০: সুপার সামারি
স্টিভেন বার্টলেট একজন উদ্যোক্তা এবং ইনভেস্টর। উনার বিখ্যাত একটা পডকাস্ট আছে ‘দ্য ডায়রি অফ অ্যা সিইও’ নামে। একই নামে উনার একটা বই আছে। সম্প্রতি বইটা পড়ে শেষ করলাম। ইউটিউবে বইটার রিভিউ দিয়েছি। এখানে ক্লিক করলে দেখতে পারবেন।
বইটা পড়ার পেছনে মূল উদ্দেশ্য ছিলো উনার পডকাস্ট এর নির্জাস নেয়া। ভেবেছিলাম পডকাস্ট থেকে বেছে বেছে ভালো জিনিসপত্র এড করেছেন এই বইতে। ওয়েল, এটা আংশিক সত্য। আংশিক কেননা পডকাস্ট এর পাশাপাশি উনার নিজের অভিজ্ঞতার কথাবার্তাও এখানে আছে অনেক। এর সংখ্যাই বেশি।
বইটায় ৩৩টা ল’ আছে ‘ব্যবসা ও জীবন’ নিয়ে। এর মধ্যে ৮-১০টার মতো ল’ আমার ভালো লেগেছে। এগুলো নিয়ে আমি প্রতি পর্বে ১টা বা ২টা ল’ মিলিয়ে লিখবো বলে ঠিক করেছি। আর তা থেকে ভাবলাম এই পর্ব অর্থাৎ শূন্য (০) পর্বে পুরো বইয়ের সব ল’ নিয়ে খুবই সংক্ষিপ্ত করে সামারি লিখি। এটা রিভিউ না, আলোচনা না, সমালোচনাও না। খুবই ছোট একটা সামারি। আমি এখানে কিছুই ব্যখ্যা করবো না। এটায় আশাকরি আপনাদের লাভ হবে বইটা আপনি পড়বেন কি-না সেটা ঠিক করতে। আবার এই সামারিগুলো এডভাইস হিসেবেও নেয়া যায়।
এখানে সিরিয়াল নম্বরগুলো হলো মূল বইয়ের সূচীপত্র অনুযায়ী ল’ নম্বর। তিনি বইটাকে ৪টা পিলারে (পার্টে) ভাগ করেছেন। বার্টলেটের মতে গ্রেট হতে গেলে না গ্রেট জিনিস বানাতে গেলে এই ৪টা পিলারে মাস্টারি অর্জন করতে হবে। পিলারের ভেতরে ল’ গুলো আছে। এখানে একত্রে সামারি করেছি।
পিলার ১: দ্য সেল্ফ
এটা নিজের পিলার। সেল্ফ অ্যাওয়ারনেস, সেল্ফ কন্ট্রোল, সেল্ফ কেয়ার, সেল্ফ কনডাক্ট, সেল্ফ স্টিম আর সেল্ফ স্টোরি এসব নিয়ে এই পিলার।
১. আপনার পটেনশিয়াল ৫টা জিনিসের উপর নির্ভর করে। তিনি এগুলোকে বাকেট হিসেবে দেখিয়েছেন। একটা বাকেট ফিল না করে পরেরটায় যাওয়া অনুচিত। অর্থাৎ সিরিয়ালি যেতে হবে। তার মধ্যে প্রথম দুটো বাকেট সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কারণ বাকিগুলো চেঞ্জ হতে পারে। কিন্তু এগুলো হারাবে না কখনো। বাকেট ৫টা:
1. What you know (your knowledge)
2. What you can do (your skills)
3. Who you know (your network)
4. What you have (your resources)
5. What the world thinks of you (your reputation)
২. শেখানোর মাধ্যমেই শেখা হয়। শেখানোর সময় ভুল থেকে, কনফিউশান থেকে শিখবেন। এটা হলো ফাইনম্যান টেকনিক। তাই শেখার পর শেখানোর একটা উপায় রাখা উচিত সবসময়।
৩. নেগোসিয়েশন বা আর্গুমেন্ট এ ডিজএগ্রি বা নেগেটিভ ভাবে শুরু করবেন না। কমনগ্রাউন্ড দিয়ে শুরু করে নিজের মত পর্যন্ত যাবেন।
৪. আপনার নিজের ওপর যে বিশ্বাসটা আপনার আছে সেটায় আশেপাশের প্রভাব আছে। ফলে অনেক কিছুই হয়তো আপনি করতে চান বা পারবেন কিন্তু আপনার লিমিটের বাইরে ভেবে করেন না। কিন্তু এই লিমিটের বিশ্বাসটা আপনার নিজের না পুরোপুরি। অধিকাংশই সমাজের বেধে দেয়া। সুতরাং এটা ভাঙা দরকার। নতুন একটা কিছু করতে গেলে ভয় না পেয়ে একশন নেন বা কাজ করে যান। কাজ থেকে যেসব ভালো আউটকাম আসবে তা থেকে আত্মবিশ্বাস জন্মাবে এবং লিমিটেড বিশ্বাস ভেঙে যাবে।
৫. কিছু না বুঝলে, পরিবর্তন বা চ্যালেঞ্জ এলে ভয় না পেয়ে যা বুঝেন না বা ভয় পান সেটা নিয়ে ঘাটাঘাটি বা পড়াশোনা করেন, এক্সপেরিমেন্ট করেন। ভয় পেয়ে লাভ নেই। যেমন: AI নতুন জিনিস। কেউ বুঝবে না ভেবে, কাজ হারানোর ভয়ে প্যানিক করলে, উলটো পথে হাটলে বা সব গুটিয়ে বসে থেকে লাভ নেই। আয়ত্তে আনা লাগবে। মানিয়ে নিতে হবে।
৬. সরাসরি স্টেটমেন্ট থেকে প্রশ্নোত্তর টাইপের কাজ বেশি ইফেক্টিভ। কিছু একটা করা বা মোটিভেশন এর ক্ষেত্রেও। ভালো প্রশ্ন স্বভাবে পরিবর্তন আনতে পারে। বিশেষ করে আইডেন্টিটি সংক্রান্ত হ্যাঁ/না টাইপের গুলো। কেননা এর মাঝে ‘কিন্তু’ এর কোনো জায়গায় থাকে না। ফলে হ্যাঁ বলার পরে কাজ করার দিকে বেশি ঝুঁকতে পারে। যেমন: ‘Will you eat more healthy?’
৭. খেসারত দিতে হবে না, কেউ দেখছে না কিন্তু কাজটা বা চর্চা করতে খুব খারাপ অবস্থা হচ্ছে নিজের– এমন অবস্থায়ও নিজেকে ঠকাবেন না বা হাল ছাড়বেন না। এমন ছোটখাটো বিষয়ে হাল ছাড়লে বড়ো বড়ো বিষয়ে হাল ছেড়ে দেয়ার প্রবণতা প্রবল হয়। এসব ছোটছোট ইভেন্টই মেন্টাল টাফনেস বাড়ায় আস্তে আস্তে।
৮. ইচ্ছাশক্তি একটা লিমিটেড জিনিস। ফলে খারাপ অভ্যাস পরিবর্তন করতে গিয়ে ফাইট করলে এটা ফুরিয়ে যায়। আবার এক সাথে কয়েকটা হ্যাবিটেও ফোকাস করা অনুচিত। খারাপ অভ্যাস পাল্টাতে আপনার উচিত এই পাল্টানোর চিন্তা বাদ দিয়ে, যেই ভালো অভ্যাসটার সাথে এটা পাল্টাতে চান সেই ভালো অভ্যাসে বেশি বেশি ফোকাস দেয়া। সেসাথে খারাপ অভ্যাসটা করতে যত জটিল অবস্থা তৈরি করা যায় এবং ভালো অভ্যাসটা যত সহজে করা যায় তার জন্য পরিবেশ তৈরি করা এবং রিওয়ার্ড রাখা। এই চ্যাপ্টারে দ্য পাওয়ার অব হ্যাবিটের Cue-Routine-Reward এই হ্যাবিট লুপের কথা বলা হয়েছে।
৯. স্বাস্থ্যই সব কিছুর মূল।
পিলার ২: দ্য স্টোরি
এখানে স্টোরি ব্যবহার করে মার্কেটিং বা মানুষকে ইনফ্লুয়েন্স করার ওয়ে নিয়ে লেখা।
১০. মানুষজন অ্যাবসার্ড জিনিসপত্র বা ঘটনা বেশি মনে রাখে।
১১. একই সিস্টেমের মার্কেটিং বা মানুষকে ইনফ্লুয়েন্স করার কাজ বার বার করলে একটা সময় সেটা মানুষের ওপর কাজে আসে না। মানুষ পাত্তা দেয় না। তাই নতুন নতুন সিস্টেমে কাজ করা উচিত। অর্থাৎ মানুষকে কিছু একটা ফিল করাতে হবে কমন সিস্টেমের বাইরে গিয়ে।
১২. অনেক সময় কিছু সংখ্যক মানুষ ক্ষেপে গেলেও বোঝা যায় আপনার কাজ ঠিকঠাক এগোচ্ছে।
১৩. ছোট খাটো চেঞ্জ এর মাধ্যমে পার্সেপশান চেঞ্জ করা যায়। পার্সেপশান ভ্যালু বাড়াতে পারে।
১৪. ফ্রিকশন ভেলুর জন্ম দিতে পারে। এই ফ্রিকশনটাও পার্সেপশান চেঞ্জের অংশ। মানুষ সবসময় সরাসরি দোকানের জিনিস খেতে চায় না, কিন্তু বাসায় দোকানের জিনিস এনে একটু নিজে বানিয়ে সেটা খেতে চায়। সে নিজে এটায় অংশ নিয়েছে বিধায় তার কাছে এর ভ্যালু বেশি। অথচ এটায় সরাসরি রেডি করা খাবার থেকে ভ্যালু কম। আবার, কাজ একটু স্লো দেখিয়ে কাজ করছে বোঝানো, স্বাদ মেডিসিনের মতো করে কাজের জিনিস বোঝানো এসবও মানুষের উপর কাজ করে। অর্থাৎ মানুষ সবসময় লজিক্যাল ভাবে না। আর সেটা কাজে লাগিয়ে ভ্যালু বাড়ানো যায়। তবে এটারও একটা লিমিট আছে কতটুকু ফ্রিকশন এড করা যাবে।
১৫. কোনো কিছু কিভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে সেটা ইম্পর্ট্যান্ট। কখনো কখনো এই উপস্থাপনা সেই জিনিসটা থেকেও বেশি ইম্পর্ট্যান্ট।
১৬. কিছু বিক্রি করতে গেলে শুধুমাত্র ১টা অপশন দেখাবেন না। একাধিক অপশন দেখাবেন। ক্রেতা কনটেক্সট পাবে একটা। ফোন কিনতে গেলে দেখবেন কোম্পানি নানান রেঞ্জে ফোন রাখে।
১৭. Endowment effect নামে একটা কগনিটিভ বায়াস আছে। আপনার কাছে থাকা প্রিয় একটা জিনিস আর দোকানে বিদ্যমান সেইম জিনিসটার ক্ষেত্রে আপনি আপনার নিজের own করা জিনিসটাকে বেশি ভ্যালুয়েবল মনে করেন। নিজেরটায় অ্যাটাচমেন্ট কাজ করে। এটা বিক্রেতারা কাজে লাগায়। স্যাম্পল হিসেবে বা সাময়িক ভাবে ট্রাই করতে দিয়ে।
১৮. এটেনশন যদি নেয়া লাগে তাহলে প্রথম ৫ সেকেন্ডের মধ্যে এটেনশন নেয়ার চেষ্টা করা বেটার।
পিলার ৩: দ্য ফিলোসোফি
পার্সোনাল এবং প্রোফেশনাল লাইফে গ্রেট মানুষদের ফিলোসোফি কেমন তা নিয়ে এই পিলার।
১৯. কাইজেন একটা জাপানি ফিলোসোফি। এর মানে continuous improvement বা change for the better। ছোটখাটো চেঞ্জ এর মাধ্যমে ১% করে প্রতিদিন উন্নতি করলে একটা সময় বিরাট পরিবর্তন লক্ষ্য করা যায়। এটার জন্য লাগে ধৈর্য্য, আত্মবিশ্বাস।
২০. ছোট খাটো জিনিস মিস দিলে বা এভয়েড করে পরে সেটা বিশালাকারে পরিণত হবে এবং মিস যাবে। তাই এসব নিয়ে টাইম করে বসা লাগবে। চেকে রাখা লাগবে। যেনো এভয়েড বা মিস না যায়।
২১. ফেইল করার রেট যত বেশি সাকসেসের সুযোগও ততো বেশি। তাই যত ফাস্ট ফেইল করা যায় ততো ভালো। এখানে এক্সপেরিমেন্ট বা লো কস্ট ফেইলের কথা বলা হচ্ছে। এখান থেকে ফিডব্যাক নিয়ে প্রতি ট্রায়ালে বেটার করা যাবে।
২২. Plan B থাকাটা Plan A এর জন্য ক্ষতিকর হতে পারে। সেটা যেনো না হয় সেদিকে লক্ষ্য রাখা উচিত। আর সবসময় Plan B খারাপ না।
২৩. Ostrich effect হলো উটপাখি যেমন ডেঞ্জার সেন্স করে তখন মাটিতে মাথা ঢুকিয়ে ফেলে, মানুষও তেমন অস্বস্তিকর বা কঠিন সিচুয়েশন, তথ্য ও কথাবার্তা এভয়েড করে। এভাবে এভয়েড করার ফলে সেটা পরে বড় ঝামেলায় রূপ নেয়। এগুলো যত তাড়াতাড়ি ডিল করা যায় ততো ভালো।
২৪. প্রেশার খারাপ না। ভালো প্রেশারও আছে। ভালো প্রেশার গ্রোথে হেল্প করে। এসব ভালো প্রেশারকে প্রিভিলেজ হিসেবে দেখা উচিত।
২৫. কোনো একটা আইডিয়া বা চিন্তা মাথায় এলো। অনেক ভেবে চিন্তে ঠিক করলেন কাজে লাগাবেন বা একশন নিবেন। তার আগে নিজেকে জিগ্যেস করবেন: ‘Why will this idea fail?’। এটার উত্তর নিয়ে চিন্তায় রিস্ক, রেড ফ্ল্যাগ এসব ধরা দিবে। সেগুলো সমাধান নিয়েও কাজ করতে পারবেন তখন আগে থেকে।
২৬. স্কিল জিনিসটা কনটেক্সট এর ওপর ডিপেন্ড করে। সেইম স্কিল এক ইন্ডাস্ট্রিতে বেশি ভ্যালুয়েবল আবার আরেক ইন্ডাস্ট্রিতে কম ভ্যালুয়েবল হতে পারে। ভ্যালু বেশি হলে ওখানে স্বভাবতই পে করবে বেশি।
২৭. জীবন একটাই। আমাদের এই পৃথিবীতে সময় খুবই কম এবং লিমিটেড। সুতরাং এই লিমিটেড সময় আপনি যেভাবে কাটাতে চান, যা যা করতে চান সেগুলোতে ফোকাস করা উচিত। বাকি সবে যতো কম সময় দেয়া যায় ততো ভালো। ডিসিপ্লিনের মাধ্যমে এটা করা যেতে পারে। চ্যাপ্টারে এই ইকুয়েশনটা আছে: Discipline = the value of the goal + the reward of the pursuit - the cost of the pursuit।
পিলার ৪: দ্য টিম
ভালো টিম গঠনে এবং টিমের মানুষ থেকে বেস্ট আউটপুট নেয়ার উপায় নিয়ে আলোচনা এই পিলারে।
২৮. একেক জন একেক ফিল্ডে ভালো হয়। সেজন্য আপনার প্রয়োজনীয় ফিল্ডে যে ভালো তাকে এপ্রোচ করতে পারেন আপনার ইগোটা সরিয়ে।
২৯. কোম্পানির কালচার ইম্পর্ট্যান্ট এবং এটা স্ট্রং হওয়া উচিত। কাল্ট কালচার শুরুতে ভালো, লং রানে খারাপ।
৩০. ভালো টিম বানাতে বা ম্যানেজ করতে ৩টা Bar ইউজ করা যায়। Bar raiser, Bar Maintainer, Bar lowerer। এই বার ইউজ করে fire, hire & train করার সিদ্ধান্ত নেয়া যায়।
৩১. ছোটখাটো উইন ইম্পর্ট্যান্ট। ওগুলো সেলিব্রেট করাও ইম্পর্ট্যান্ট। কারণ এটা ফরওয়ার্ড মোশান এর সেন্স দেয়।
৩২. লিডার বা ম্যানেজারকে হতে হবে ফ্লুইড বা ফ্লেক্সিবল। টিমের সবাইকে সমান ভাবে ট্রিট করা যায় না কারণ সবাইকে এক জিনিস দ্বারা প্রভাবিত করা যায় না। মোটিভেটও করা যায় না। একেক জনের অবস্থা নিয়ে তার আইডিয়া থাকা লাগবে এবং সে অনুযায়ী একশন নিতে হবে।
(পিলারের বাইরে ৩৩ নম্বর ল' আলাদা করে দেয়া।)
৩৩. শেখার কোনো শেষ নেই।
এই হলো বইয়ের সবকটা ল’ এর সামারি।


