সাহিত্যিক মাহবুব-উল-আলম পরিচিতি
(সাহিত্যিক মাহবুব-উল-আলম কে নিয়ে যেহেতু আলাপ-আলোচনা কম হয় এবং ইন্টারনেটেও অতো লেখাজোকা নেই উনাকে নিয়ে তাই ভাবলাম উনার ওপর এই লেখাটা, যেটা দিয়ে উনার সহিত আমার পরিচয় ঘটেছে, সেটা সংগ্রহ করে রাখা যায়। এ বিবেচনায় লেখাটি এখানে দেয়া হলো। লেখাটি নেয়া হয়েছে অনন্যা প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত লেখক সুব্রত বড়ুয়া'র প্রবন্ধ সংকলন ‘সাহিত্য সমাজ ও বিজ্ঞান’ গ্রন্থ থেকে।)
শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি: মাহবুব-উল-আলম
– সুব্রত বড়ুয়া
১.
বিগত শতাব্দীর পঞ্চাশের দশকের মাঝামাঝি সময়ে, আমি যখন গ্রাম ছেড়ে শহরের স্কুলে পড়তে আসি সেই সময়, চট্টগ্রাম শহরে আমাদের বাসায় ডাকযোগে নিয়মিত একটি সাপ্তাহিক পত্রিকা আসত। পত্রিকাটির নাম 'সাপ্তাহিক জমানা'। ট্যাবলয়েড সাইজের কাগজ, আড়াআড়ি চার কি পাঁচ ভাঁজ করে বুক পোস্ট করার জন্য কাগজের পাতার ভাঁজ থেকে ঘুরিয়ে দেওয়া আর একটি কাগজে লেখা থাকত প্রাপকের ঠিকানা। আমার বাবা ছিলেন পত্রিকাটির নিয়মিত গ্রাহক। আমি ছিলাম এর দ্বিতীয় একনিষ্ঠ পাঠক। তখন পড়ার ক্ষুধা জেগে উঠছিল প্রচণ্ডভাবে। স্কুলে পড়ার বইয়ের বাইরেও হাতের কাছে যা পাই তাই পড়ি। সাপ্তাহিক জমানায় বিভিন্ন খবর ছাড়াও ধারাবাহিক কিছু লেখা থাকত, গল্প ইত্যাদিও- সেসব লেখা পড়ে বুঝবার মতো বয়স বা জ্ঞান কিছুই তখন আমার হয়নি, তবু পড়ি। আবছা মনে পড়ছে- কোনো এক লেখকের ধারাবাহিক একটি গোয়েন্দা কাহিনী বোধ হয় নিয়মিত ছাপা হতো- সেটিই ছিল কিশোর পাঠকটির প্রধান আকর্ষণ। পরের দিকে সম্পাদক মাহবুব-উল আলমের যুক্তরাষ্ট্র ভ্রমণের কাহিনী ধারাবাহিকভাবে বেরুতে শুরু করলে সেটিও নিয়মিত পড়তে থাকি। মাহবুব-উল আলমের লেখার সঙ্গে সেই আমার প্রথম পরিচয়। পিতৃদেবের সংগ্রহে ছিল মাহবুব-উল আলমের আরও কয়েকটি বই-চট্টগ্রামের ইতিহাস-এর কয়েকটি খণ্ড এবং আলাপ (মাহবুব-উল আলম এবং অন্নদাশঙ্কর রায়ের পত্রাবলীর সংকলন)। হাত বাড়ালাম সেগুলোর দিকে। ইতিহাসের বইগুলো বেশ কঠিন মনে হয়েছিল আর আলাপ-এর বিষয়বস্তুর অন্তর্নিহিত তাৎপর্য অনুধাবন করার মতো মন ও মানস তখনো আমার তৈরিই হয়নি।
মো'মেনের জবানবন্দী পল্টন জীবনের স্মৃতি, কিংবা মফিজন ইত্যাদি বই পড়ার আগেই মানুষ মাহবুব-উল আলম, লেখক বা সাংবাদিক মাহবুব-উল আলমের দেখা পেয়ে যাই চট্টগ্রামের রাজপথে। 'পরনে পাজামা ও আসমানী রঙের আচকান, শাদা টুপী, হাতে কিছু বইপত্র বা ঝোলা কাঁধে' সদাহাস্যময় মানুষটিকে অনেক বেশি রহস্যময় ও কাছের মানুষ বলে মনে হতো, যদিও তাঁর সঙ্গে আলাপ করার মতো সাহস তখনো সঞ্চয় করে উঠতে পারিনি। অনেক পরে, জুবিলী রোডে চট্টগ্রামের নিয়াজ স্টেডিয়ামের উল্টোদিকে ইয়াসমিন প্যালেসের বাংলাদেশ বিমান-এর টিকিট কাউন্টারে তাঁকে তাঁর অনুজ ওহীদুল আলম বলে ভুল করে কি একটা কথা বলেছিলাম। তিনি, মুখে সেই রহস্যময় হাসি, বলেছিলেন যে, তিনি মাহবুব-উল আলম, ওহীদুল আমল নন। আরও বলেছিলেন, অনেকেই এ ভুলটা করে। আমি খুবই অগ্রতিভ হয়েছিলাম, কারণ ওহীদুল আলম সাহেবের সঙ্গে পূর্বে একাধিকার আমার সাক্ষাৎ ঘটেছে, তিনি বাংলা একাডেমিতে এসে আমার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং পুত্রবৎ স্নেহ সহকারে আমার কুশলাদি প্রতিবারই জানতে চেয়েছেন। এই ভুলটা যে কেন সেদিন আমার হয়েছিল-তা আজও আমি বুঝতে পারি না।
কিন্তু সে কথা থাক। সে অন্য বিষয়। আজকের বিষয়- শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলি: মাহবুব-উল আলমের 'সঙ্কট কেটে যাচ্ছে'। সঙ্কট কেটে যাচ্ছে নামে মাহবুব-উল আলমের একটি প্রবন্ধ-সংকলন প্রকাশিত হয়েছিল ১৯৫৪ সালে। এতে ভূমিকাস্বরূপ খুবই সংক্ষিপ্ত কিছু কথায় তিনি লিখেছিলেন:
'সঙ্কট কেটে যাচ্ছে' এটা আমার ঈমান, এ গ্রন্থের তথ্য নয়। তোজো ফাঁসীতে প্রাণ দেন, কিন্তু তাঁর মুখে কেউ বিকৃতি দেখেনি। তাঁর আত্মস্থ ভাব দেখে হস্তা য়ামেরিকানরা মুগ্ধ হয়েছিল। মৃত্যুর পূর্বে তোজো বলেছিলেন: জাপানীদের রক্তের প্রতি তাঁর ঈমান আছে।। বুঝতে কষ্ট হয় না যে এই ঈমানই জুগিয়েছিল তাঁকে শক্তি ও সাহস।
'আমার ঈমান পূর্ব বঙ্গের মাটির প্রতি। এ মাটি কখনও মিথ্যে হবে না-এটা আমি সমগ্র মন দিয়ে জেনেছি, হয়তঃ একদিন সমগ্র প্রাণ দিয়ে জানারও সৌভাগ্য হবে।'
বইটিতে মোট তেরোটি প্রবন্ধ সংকলিত হয়েছে। সেগুলো হচ্ছে: (১) কুমিল্লা সাংস্কৃতিক সম্মেলন, (২) খতিয়ান, (৩) ইস্লামিক সাংস্কৃতিক সম্মেলন, (৪) আমার দৃষ্টিতে, (৫) পাকিস্তানের বাংলা সাহিত্য (৬) আমাদের গল্প সাহিত্য, (৭) আমাদের নাট্য-সাহিত্য, (৮) উপন্যাস, (৯) সঙ্গীত ও চিত্রকলা, (১০) কবিতা, (১১) সাময়িকী, (১২) নূতন মতি-গতি, এবং (১৩) লোক-সঙ্গীত সম্মেলন।
রচনা-সূচির এই তালিকা থেকে সহজেই বুঝা যায় যে দেশ-বিভাগোত্তর কালে পাকিস্তান রাষ্ট্রের পূর্বাংশে সাহিত্য-সংস্কৃতি-শিক্ষা ও জীবনের ক্ষেত্রে যেসব সঙ্কট তখন দেখা দিয়েছিল কিংবা দেখা দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছিল তার পরিপ্রেক্ষিতে অতীত ঐতিহ্যের প্রতি সচেতন দৃষ্টিপাত এবং নতুন সম্ভাবনার দিগন্তের অনুসন্ধানই ছিল মাহবুব-উল আলমের সুচিন্তিত ও সচেতন প্রয়াস। তবে এই প্রয়াসের ও পর্যবেক্ষণের বিস্তারিত বক্তব্যের আলোচনা শুরুর আগে আমাদের একবার জেনে নেওয়া উচিত মাহবুব-উল আলমের তপূর্বেকার জীবন ও সাহিত্যকর্ম সম্বন্ধে, যার পরিপ্রেক্ষিত ব্যতীত কোনো আলোচনাই পূর্ণাঙ্গ হওয়া সম্ভব নয়।
২.
চট্টগ্রাম শহর থেকে আট-দশ মাইল দূরে অবস্থিত দুটি বর্ধিষ্ণু গ্রাম-ফতেপুর ও ফতেহাবাদ। স্থল ও জলপথে এ গ্রাম দুটির সঙ্গে চট্টগ্রাম শহরের যোগাযোগ ছিল অতি প্রাচীনকাল থেকেই। ফতেপুর গ্রাম ছিল মাহবুব-উল আলমের পিতৃপুরুষদের ভদ্রাসন। আত্মপরিচয় প্রদানসূত্রে তিনি লিখেছেন:
বহু পুরুষ ধরে আল্লাওয়ালা লোকের যে ধারা অমাদের দেশে চলে আসছিল আমার দেহে তাঁদের রক্ত প্রবাহিত ছিল। আমাদের ছিল খোন্দকার বংশ। মা ছিলেন কাজী বংশের মেয়ে। উভয় বংশেরই বৈশিষ্ট্য ছিল অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা। শাহী জামানায় আমাদের ভদ্রাসন নিষ্কর করে দেয়া হয়। ঈষ্ট ইন্ডিয়া কোম্পানী সেটা বহাল রাখে। 'Plain living and high thinking' ছিল আমাদের চিরকালের আদর্শ। ভূমির প্রতি আমাদের কোনো লাভ ছিল না। তাই ভদ্রাসনের বাইরে আমরা কখনও কোন ভূ-সম্পত্তি অর্জন করিনি।
'আমার মাতামহ বৃটিশ সিভিলিয়ানদের উর্দু পড়াতেন। তিনি ছিলেন আলেমদের মধ্যে সব চেয়ে ষ্টাইলিশ। মুগুর ভাঁজতেন এবং শিকার করতেন বেজায়। খাওয়া পরায় আমীর ছিলেন। সুতরাং মাতামহীকে হতে হয়েছিল ভালো রাঁধুনী। আমার পিতামহ ছিলেন আরবের উটের মত প্রাচীন-পন্থী, পিতামহীও ছিলেন 'যোগ্যেন যোজয়েৎ'। তবে আমাদের বংশের যে আধ্যাত্মিক চক্ষু পিতামহ সেটা লাভ করেছিলেন। আরামের জীবন থেকে তিনি দূরে থাকতেন। খাবার অতি উৎকৃষ্ট হলে তার সঙ্গে পানি মিশিয়ে দিতেন। বলতেন 'অত ভালো খেয়ে রসনা নষ্ট হয়ে যাবে'। আমাদের ঘরে যতবারই আগুন লেগেছে পিতামহ তাঁর কোরান শরীফখানি বগলে করে বেরিয়ে গেছেন, মানুষ বা মাল কিছুরই জন্য তোয়াক্কা করেননি। এই কোরানখানি ছিল বিরাট ও ভারী। তখনকার দিনে লেখককে ষাট টাকা 'লিল্লাহ' দিয়ে পিতামহ ইহা অর্জন করেছিলেন। আর সংসারে ইহাই ছিল তাঁর আনন্দের ও গৌরবের বস্তু।'
মাহবুব-উল আলমের পিতামহ মৌলানা ফসিহউদ্দীনের তিন ছেলের মধ্যে কনিষ্ঠতম হলেন মৌলানা নসিহউদ্দীন-তিনিই মাহবুব-উল আলমের পিতা। মৌলানা নসিহউদ্দীন নিজেও ছিলেন কবি-স্বভাবের মানুষ। তিনি পুঁথিসাহিত্যের অনুরাগী ও রসাস্বাদী পাঠক ছিলেন। নিজে কবিতা লিখতেন। আবদুর রহমান জামীর ফার্সী কাব্য 'যুসুফ-জোলেখা' তিনি বাংলা পয়ার পদ্যে অনুবাদ করেছিলেন। মৌলানা নসিহউদ্দীনের বড় দু'ভাই মৌলবী সবিহউদ্দীন এবং মৌলবী মলিহউদ্দীনও ছিলেন আলেম। মলিহউদ্দীনের ফার্সীজ্ঞানের খ্যাতি ছিল।
মাহবুব-উল আলমের মাতামহ মৌলানা জিয়াউদ্দীন ছিলেন ফতেয়াবাদের একজন বিশিষ্ট ও উল্লেখ্য ব্যক্তিত্ব। তাঁর কন্যা আজিম-উন্নন্নেসা ছিলেন মাহবুব-উল আলমের মা। মাহবুব-উল আলমরা চার ভাই, যথাক্রমে শামসুল আলম (১৮৯৫-১৯৩৮), মাহবুব-উল আলম (১৮৯৮-১৯৮১), দিদারুল আলম (১৯০৩-১৯২৯) এবং ওহীদুল আলম (১৯১১-১৯৯৮)। মাহবুব-উল আলমের জীবনীকার মাহমুদ শাহ কোরেশী লিখেছেন:
'মৌলবী নসিহউদ্দীনের মোট ছয় ছেলে ও পাঁচ মেয়ে। দুই ছেলে ও চার মেয়ে অল্পবয়সে মারা যায়। ঐতিহ্যসূত্রে লব্ধ সুস্বাস্থ্য, ধৈর্য ও সাহস নিয়ে ধার্মিক পরিবারের চার ছেলে মানবতন্ত্রী সাহিত্য-জগতে আপন প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন-এটা বলা হয়তো অত্যুক্তি হবে না। তাঁদের মা আজিম-উননেসা বেগম ছিলেন স্বাস্থ্য, রূপ ও স্নেহশীলতায় আদর্শ রমণী।'
বড় ভাই শামসুল আলম বয়সে মাহবুব-উল আলমের চেয়ে তিন বছরের বড় ছিলেন। তাঁর কঠোর শাসনাধীনে মাহবুব-উল আলম লেখাপড়া করেছিলেন। মাহবুব-উল আলম তাঁর জীবনে বড় ভাই শামসুল আলমের প্রভাব সম্পর্কে লিখেছেন:
'জীবনের সবচেয়ে বড় বিপদ যেটা আমি এড়িয়ে গেছি সেটা হলো মাতাপিতার জ্যেষ্ঠ পুত্র হওয়ার। কারণ, যিনি জ্যেষ্ঠ ছিলেন তিনি ছিলেন 'পরশ মাণিক'। এমন একটা জিজ্ঞাসা নিয়ে তিনি জন্মেছিলেন যার শান্তি তাঁকে দিতে পারেনি মাতা-পিতা, সমাজ স্বদেশ-জাগতিক কিছুই, বিদ্রোহের আগুনে তিনি চিরদিন দহেছেন এবং অপরকেও দহিয়েছেন। অবশেষে ১৯৩৮ খ্রীষ্টাব্দের ১লা আগষ্ট ভারতীয় মুসলমানদের বিরুদ্ধে দাঙ্গার সময় ধর্মী দুর্বৃত্তেরা বর্মার লেমাগাঁও নামক স্থানে এই স্বাপ্নিক বিদ্রোহী মহাতেজস্বী মহাপ্রাণ পুরুষের জীবন হরণ করে। 'ভাইদের জন্য তিনি ছিলেন 'পরশ-মাণিক'। আমরা তাঁর হাতের গড়া, তাঁর যা জাগতিক ব্যর্থতা সেটাকে আমি এড়িয়ে গেছি-অথচ তার ক্ষতি থেকে পরিবারকে বাঁচাতে গিয়ে চির জীবন আমাকে যুদ্ধও করতে হয়েছে। তবুও আমার মনেরও মনে তিনিই এখনও গুরু।
'তাঁর দেওয়া সুরই আমরা সেধে চলেছি। জীবনে বহুবারই আমি নিজেকে প্রশ্ন করেছি "বড় ভাই না থাকলে আমি কি হতাম।"
বরাবরই উত্তর এসেছে "কিছুই না।"
(মোমেনের জবানবন্দী, পৃ চ)
আলম-ভাইদের মধ্যে তৃতীয়জন দিদারুল আলম মেজ ভাই মাহবুব-উল আলমের চেয়ে পাঁচ বছরের ছোট ছিলেন। তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন এবং বড় ভাইয়ের মতোই ছিলেন আরেক স্বাপ্নিক ও বিদ্রোহী। অল্প বয়সে স্কুল ত্যাগ করেন তিনি, কিন্তু মেধা ও মননে অত্যন্ত অগ্রসর ছিলেন বলেই সাহিত্য রচনা, সাময়িকপত্র সম্পাদনা ইত্যাদি কর্মে আপন প্রতিভার স্বাক্ষর রাখতে সক্ষম হয়েছিলেন এবং 'ছাব্বিশ বছরের আয়ুষ্কালে প্রচুর উদ্যম ও প্রতিভার পরিচয় রেখে বিস্মিত করেন অনুরাগীদের।' মাত্র ছাব্বিশ বছর বয়সে রাজরোগ যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়ে দিদারুল আলম মারা যান ১৯২৯ সালে। মাহমুদ শাহ কোরেশী লিখেছেন:
'যুগের আলো' ও 'সম্মিলনী' সম্পাদনা, গল্প-কবিতা ও উপন্যাস-রচনা, তাঁর প্রতি নজরুল, মুজাফফর আহমদ, কাজী আবদুল ওদুদ, নীহাররঞ্জন রায়, বেণীমাধব বড়য়া, জসীম উদদীন, হবীবুল্লাহ বাহার, আবদুল কাদির প্রমুখের অনুরাগ তাঁকে স্মরণীয় করে রেখেছে। সমাজের প্রতিক্রিয়াশীল শক্তির বিরুদ্ধে এবং রাজরোগ যক্ষ্মাক্রান্ত হয়ে মৃত্যুর মুখোমুখি লড়েছেন সাহসের সংগে। সাহিত্যের মাধ্যমে মানব কল্যাণ সাধন ছিলো তাঁর ব্রত। (মাহবুব-উল আলম, পৃ. ১৩)
সর্বকনিষ্ঠ ওহীদুল আলম ছিলেন মাহবুব-উল আলমের চেয়ে তেরো বছরের ছোট, আলম পরিবারের প্রথম গ্রাজুয়েট এবং পেশায় শিক্ষক। সাহিত্যের সাধনা তিনিও করেছেন এবং পৃথিবীর পথিক নামে রচিত আত্মজীবনীতে আলম-পরিবারের স্মৃতিতর্পণ করেছেন। মাহমুদ শাহ কোরশীর উক্তি:
"কৃতি সাহিত্যব্রতী এবং স্মৃতিতর্পণকারী (মেমোরিয়ালিস্ট) ওহীদুল আলম তেরো বছরের বয়োকনিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও একান্ত ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মতো সাহচর্য দিয়েছেন অগ্রজকে। দীর্ঘকাল (১৯৫৪ থেকে ১৯৮১) যষ্টিহীন দৈনন্দিন পদচারণায় ও কর্মক্ষেত্রে সংগী হয়েছেন, কাজীর দেউড়ী থেকে আন্দরকিল্লা, চন্দনপুরা থেকে পাঠানটুলী কিংবা আরো অন্য পথ-পরিক্রমায়। অবিচল সহযোগী থেকেছেন অবিরল পুস্তক প্রকাশনা ও পত্রিকা প্রচারণার অনিবার্য দায়িত্ব পালন করে।'
৩.
অগ্রজ শামসুল আলমের সুকঠোর তত্ত্বাবধানে ফতেয়াবাদ এম.ই. স্কুল থেকে পরীক্ষা দিয়ে বৃত্তিলাভ করার পর (১৯১১) মাহবুব-উল আলম চট্টগ্রাম শহরে এসে কলেজিয়েট স্কুলে ভর্তি হন। অষ্টম শ্রেণিতে উঠে স্কুল হতে পালিয়ে নানা জায়গায় ঘোরাফেরা করার ফলে তাঁর বৃত্তি কাটা যায়। অবশেষে আবার নিয়মিত লেখাপড়া করে ১৯১৫ সালে প্রবেশিকা পরীক্ষা উত্তীর্ণ হয়ে চট্টগ্রাম কলেজে ভর্তি হন। ১৯১৬ সালে তাঁর শুভ পরিণয় সম্পন্ন হয়। বয়ঃসন্ধিক্ষণের এ পর্যায়টির কথা নিপুণভাবে উঠে এসেছে তাঁর মো'মেনের জবানবন্দী উপন্যাসে:
'বিছানায় শুইয়া ঘুম আসিতেছে না। জ্যোৎস্না আমি সহ্য করিতে পারি না। জ্যোৎস্না আমাকে পাগল করিয়া তোলে। পাতাল, মর্ত্য ও আকাশের যেন সব দ্বার খুলিয়া যায়, আর প্রত্যেক দ্বারে ধরাধরি করিয়া যেন জাগে তাহাদের যুগল রূপ যাহারা জীবনে ভোগ করিল না মিলনের সুখ-শিরী ও ফরহাদের, লাইলী ও মজনুর, ইউসুফ ও জোলেখার, শৈবলিনী ও চন্দ্রশেখরের, দলনী বেগম ও মীর কাসিমের। আমি নিজেকে ভাবি যেন মজনু, যেন ইউসুফ, যেন চন্দ্রশেখর, আবার যেন লায়লী, যেন শিরী, যেন জোলেখা... আমার চেখে জল আসে। হঠাৎ আমি হৃদয়ের চীৎকার শুনিতে পাই; কোথায় কোথায়, আমার অপেক্ষায় বসিয়া আছে একটা দেহ, আমার মনকে খুঁজিয়া ফিরিতেছে আর একটি মন- সে কোথায়?'
'বিবাহ হইয়া গেল', কিন্তু রোমান্টিক স্বপ্নাক্রান্ত নবীন যুবকের মন বালিকা-বধূর মধ্যে স্বপ্নচারিণী প্রণয়িনীর সন্ধান করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়ে ভাবে—'বিংশ শতাব্দীর মজনু, তোমার পুরাবৃত্ত সব ভুল।' মাহবুব-উল আলম যুদ্ধের সৈনিক হওয়ার জন্য নাম লেখালেন এবং বাঙালি পল্টনে যোগদানের জন্য ১৯১৭সালের জুন মাসের শেষের দিকে চট্টগ্রাম ত্যাগ করলেন। প্রথমে করাচি, তারপর যুদ্ধক্ষেত্রে দায়িত্ব পালন করেন। অবশেষে যুদ্ধশেষে ১৯২০ সালে, তিন বছর পর, বসরা এবং পরে বাগদাদ, তাজিজিয়া ইত্যাদি স্থানে 'সিগনেলার' হিসেবে বাড়ি ফিরে এলেন। এ প্রসঙ্গটি শোনা যেতে পারে তাঁর জবানীতে:
'অতঃপর বাড়ী ফিরিয়া আসিলাম।
'তিন বছরের কষ্টে তাহাকে জয় করিয়াছি এই অভিমান লইয়া তাহার সম্মুখীন হইলাম। দেখিলাম যাহার উপর আমার অভিমান সে পাগলী বৌ নাই। এ পূর্ণ বিকশিতা নারী...। এর প্রতি কণা যেন সজীব, প্রতি কণা যেন এক একটি নারী হইয়া আপনার ঐশ্বর্য্যে আপনি ডগগ্নগ্।"
(মো'মেনের জবানবন্দী, পৃ ৭৫)
আর সেই পূর্ণবিকশিতা নারীর অন্তরের ঐশ্বর্যের পরিচয় যেন আরও মহিমান্বিত।
'নারী বলিল: তিন বৎসর কারও প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করি নাই পাছে তোমার অমঙ্গল হয়। মোনাজাতে প্রথম প্রথম তোমার জন্য নিরাপত্তা ও সুখ প্রার্থনা করতাম। কিন্তু শুধু ইহাতে মন তৃপ্ত হ'ত না। এখন আপন পর পৃথিবীর সকলের জন্য নিরাপত্তা ও সুখ প্রার্থনা করি। ইহাতে অন্তর পুরে।' (মো'মেনের জবানবন্দী, পৃ ৯৬)
8.
যুদ্ধপ্রত্যাগত সৈনিকের জন্য পুলিশের দারোগার চাকরি সহজলভ্য ছিল। কিন্তু তাঁর পিতার সে চাকরি পছন্দ নয়। অবশেষে হলেন সাব-রেজিস্ট্রার। সরকারি চাকরির আর্থিক নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা এবং সামাজিক মর্যাদা মাহবুব-উল আলমের এতদিনকার অনিশ্চিত কর্মজীবনে নিয়ে এলো স্থিতিশীলতা। চাকরি-সূত্রে চট্টগ্রাম সদর, রাউজান, হাটহাজারী, কাটিরহাট, কাজীর হাট, ফটিকছড়ি, পটিয়া, বাঁশখালী, কক্সবাজার প্রভৃতি স্থানে এবং চট্টগ্রামের বাইরেও সিলেট, খুলনা, ঢাকা, ময়মনসিংহ, কুমিল্লায় দীর্ঘকাল কাটাতে হয়েছে তাঁকে। দীর্ঘ বত্রিশ বছর চাকরি করার পর ১৯৫৩ সালে তিনি চাকরি থেকে অবস গ্রহণ করেন। সাব-রেজিস্ট্রারের চাকরিতে আর্থিক সমৃদ্ধি অর্জনের সুযোগ যথেষ্ট ছিল, কিন্তু অর্থের চাইতেও পরমার্থ যাঁর অভীষ্ট তাঁর জন্য সেখানে অবারিত হয়েছিল অন্য এক সুযোগ- বিচিত্র জনপদের বিচিত্র জীবনচর্চার সঙ্গে নিবিড় পরিচয়-লাভ এবং দেশের মানুষ ও প্রকৃতির গভীর সান্নিধ্য অর্জন। জীবনীকার মাহমুদ শাহ কোরেশীর ভাষায় 'আর্থিক উন্নয়নের চাইতেও আত্মিক বিকাশের বিষয়টি প্রাধান্য লাভ করেছে তাঁর সাধনায়-কর্ম ও সাহিত্য জীবন যেখানে একাকার হয়ে আছে।'
বিশ শতকের ত্রিশের দশক থেকে ১৯৮১ সালের ৭ই আগস্ট তারিখে মৃত্যুর পূর্বপর্যন্ত পঞ্চাশ বছরের সাহিত্য-সাধনায় মাহবুব-উল আলমের রচনার পরিমাণ উপেক্ষণীয় নয় মোটেও। বিশের দশকে তাঁর সাহিত্য-সাধনার সূত্রপাত ঘটলেও এবং প্রথমদিকে মেজভাই দিদারুল আলম সম্পাদিত যুগের আলো পত্রিকায় 'গ্রাম্যচাষী' ছদ্মনামে সমাজোন্নয়নমূলক নিবন্ধ রচনার মাধ্যমে সাহিত্যকর্মে সংশ্লিষ্ট হলেও কথাসাহিত্যে তাঁর আগমন ঘটে ১৯২৪ সালে। যুগের আলো পত্রিকায় দুটি গল্প 'জয় পরাজয়' এবং 'বুড়ি' প্রকাশিত হওয়ার পর থেকেই। গল্প লেখা অব্যাহত বইল আর বৈঠকী গল্পের সমঝদার শ্রোতাদের (অন্নদাশঙ্কর রায়, মদনগোপাল কাউল, আবুল ফজল, হবীবুল্লাহ বাহার, আবদুল কাদির প্রমুখ) প্রেরণা ও তাগিদে অবশেষে লিখলেন তাঁর সৈনিক জীবনের কাহিনী নিয়ে পল্টন জীবনের স্মৃতি। সেটি ছাপা হয়েছিল 'মাসিক মোহাম্মদী পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে। পত্রিকাটির ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক তখন আবুল কালাম শামসুদ্দিন। তিনি লিখেছেন:
'বস্তুতঃ যেমন অতি সুন্দর হস্তাক্ষর, তেমনি অপূর্ব সুন্দর রচনা-ভাষা, ভাব, প্রকাশভঙ্গী, নিজস্ব ষ্টাইল সবদিক দিয়া। একেবারে তাজ্জব হইয়া গেলাম। আধুনিক মুসলিম বাংলা সাহিত্যের শৈশবে কোথা হইতে আসিল যৌবনের গরিমা লইয়া এই নবীন সাহিত্য-শিল্পী? ...'পল্টন জীবনের স্মৃতি' যদিও ঠিক কথা সাহিত্য নয়, তবু মনে হইল, যিনি ইহা লিখিয়াছেন, তাঁর মধ্যে কথাসাহিত্য রচনার শক্তি রহিয়াছে অপর্যাপ্ত। কারণ যে পর্যবেক্ষণ যথার্থই রচনার বড় কথা, লেখকের এই জীবন-স্মৃতির প্রথম কয়েক পাতার মধ্যেও তার নির্ভুল পরিচয় পাওয়া গেল।' (পল্টন জীবনের স্মৃতি, ভূমিকা)
পল্টন জীবনের স্মৃতি পাঠক সমক্ষে উপস্থাপিত হওয়ার পর পরই বুলবুল পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হতে থাকে মাহবুব-উল আলমের অবিস্মরণীয় সৃষ্টি মো'মেনের জবানবন্দী'। ১৯৪৬ (১৯৪৩?) সালে সেটি গ্রন্থাকারে প্রকাশ করেন সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ কলকাতার কমরেড পাবলিশার্স থেকে। মো'মেনের জবানবন্দী কাহিনীঋদ্ধ ছকে-বাঁধা উপন্যাস নয়, তাই কেউ কেউ উপন্যাস বলে একে মানতে নারাজ। লেখক নিজেও বলেছেন যে, এটি Part autobiography এবং part fiction অন্নদাশঙ্কর রায়ের মতে এটি 'আত্মনিবেদনের ও আত্মসমালোচনার ঐতিহাসিক উপন্যাস'। জীবনীকার মাহমুদ শাহ কোরেশীর মূল্যায়ন:
"... মো'মেনের জবানবন্দী'-আপাতদৃষ্টিতে লেখকের জীবনস্মৃতি- কৈশোর ও যৌবনের স্মৃতিগত তাৎপর্যের বিবরণ ও বিশ্লেষণ। আসলে এ বই এসবের অনেক বেশী। একথা বললে অত্যুক্তি হয় না যে, শতাব্দীর গোড়ার দিকে মার্সেল প্রস্ত প্রমুখ যে চেতনা-প্রবাহনীতির ধারা সূচিত করেছিলেন তাতে আরেকটি মাত্রা যোগ করলেন মাহবুব-উল আলম। কেননা এক সম্পূর্ণ নতুন পরিপ্রেক্ষিতে তিনি নির্মাণ করলেন নিম্নবিত্ত বাঙালি মুসলমানের প্রথম সমাজচিত্র।...' (মাহবুব-উল আলম, পৃ ৪৩)
১৯৪০ সালে গাঁয়ের মায়া নামে মাহবুব-উল আলমের একটি উপন্যাস প্রকাশিত হলেও, তাঁর উল্লেখযোগ্য দুটি বই গল্পগ্রন্থ তাজিয়া এবং উপন্যাস মফিজন প্রকাশিত হয় ১৯৪৬ সালে। তাজিয়া সম্পর্কে কাজী আবদুল ওদুদের মূল্যায়ন (কলিকাতা, ১লা মে ১৯৪৯):
'বন্ধুবর মাহবুব-উল আলম স্বভাব-শিল্পী। তাঁর কথা সহজেই ব্যক্ত হয় রেখা ও রঙের বৈচিত্র নিয়ে। এই গুণে তাঁর 'পল্টনজীবনের স্মৃতি'র কাল থেকেই তাঁর সাহিত্যিক জনপ্রিয়তা লাভ হয়েছে।
'তাঁর এই ক্ষমতার প্রকাশ হয়েছে প্রধানতঃ দুই ধারায়; এক ধারায় তিনি মুখ্যতঃ শিল্পী, ছবি আঁকায় তাঁর যে আনন্দ তা ছাপিয়ে উঠেছে তাঁর আর সব চেষ্টা, অন্য ধারায় তাঁর শিল্পীত্ব স্নান হয়নি, কিন্তু তিনি যে এক বিশেষ যুগের ও বিশেষ সমাজের মানুষ, সেই বিশেষ যুগের ও বিশেষ সমাজের ভাবনায়-অথবা দুর্ভাবনায় তিনিও যে বিব্রত, তার পরিচয় স্পষ্ট। প্রথম ধারায় তাঁর অনন্য সাধারণ সাফল্য লাভ হয়েছে 'মোমেনের জবানবন্দী'তে, দ্বিতীয় ধারায় তাঁর বিশিষ্ট রচনা 'তাজিয়া'।' (তাজিয়া, ৩য় মুদ্রণ, ১৯৬৬)
'মফিজন'-এর তৃতীয় মুদ্রণের মুখবন্ধে মাহবুব-উল-আলম লিখেছেন: 'মফিজন'-এর অনেক প্রতিকূল সমালোচনা হইয়াছে। অল্প-সংখ্যক শিল্প-রসিকের মত: এইটি একটি অনবদ্য শ্রেষ্ঠ রচনা, অধিক সংখ্যক পাঠকের রায়: রচনাটি অশ্লীল।
অন্নদাশঙ্কর রায় লিখেছেন, 'কারিগরি বা Craftsman ship এর দিক থেকে রচনাটি মহামূল্য।'
'ক্ষুদ্রাকৃতির এ বইটিকে উপন্যাস বলা সঙ্গত কিনা এ নিয়ে বিতর্কের অবসান এখনো ঘটেনি। অনেকের মতে মফিজনকে উপন্যাসিকা বলাই অধিকতর যুক্তিসঙ্গত। মোমেনের জবানবন্দীতে এক নামহীনা কিশোরীর উল্লেখ বিভিন্ন স্থানে ও বিভিন্ন পর্যায়ে ঘুরে ঘুরে ফিরে এসেছে।
'জীবনপথে মানবমনে কত রহস্যই না সঞ্চিত হয়। সে রহস্যের সরল সমাধান দেহ-মনের তত্ত্বকথায় সম্পূর্ণরূপে ব্যক্ত হওয়া সম্ভব নয়। এই রহস্যের মধ্যে 'সুখের মতো ব্যথা'ও যেন কেমন অনিবার্য ও ওতপ্রোতভাবে অঙ্গীভূত হয়ে যায়। জীবনরসিক জীবনশিল্পী তাঁর ইঙ্গিতময় প্রকাশভঙ্গি ও অনবদ্য নিরাবেগ ভাষায় মফিজনকে চিত্রিত করেছেন বর্ণাঢ্য রঙের স্বপ্নিল আবেগ দিয়ে নয়। রেখাচিত্রের নিপুণ আঁচড়ে। আবুল ফজলের ভাষায়: মফিজন সত্যিকার বাস্তব জীবনের গল্প।... রক্তমাংসের কল-কল্লোলের সঙ্গে যে রয়েছে জীবন ও জীবন-বিকাশের নিবিড় যোগ তা কে অস্বীকার করতে পারে।...'
৫.
কথাসাহিত্যিক মাহবুব-উল আলমের সকল রচনার পরিচয় উপস্থাপন এ রচনার স্বল্প পরিসরে অসম্ভব। শুরুতে সঙ্কট কেটে যাচ্ছে নিয়ে যে আলোচনার সূত্রপাত করার চেষ্টা করা হয়েছিল- এবারে সে এসঙ্গে ফিরে আসার চেষ্টা করা যেতে পারে। ১৯৫২ সালের ২২, ২৩ ও ২৪শে আগস্ট কমিল্লায় যে সাংস্কৃতিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয় সে সম্পর্কে মাহবুব-উল আলম লিখেছিলেন: 'আমাদের সংস্কৃতি-সঙ্কট কেটে যাচ্ছে। কুমিল্লা সাংস্কৃতিক সম্মেলনের ইহাই বাণী।
২৩শে আগস্টের অধিবেশনে প্রদত্ত সভাপতির ভাষণ 'খতিয়ান' নামে গ্রন্থভুক্ত হয়েছে। স্বভাবসুলভ রসিকতা, ব্যঙ্গ ও বিনয় সহযোগে এতে তিনি বই প্রকাশের নানা অসুবিধার কথা উল্লেখ করেছিলেন। 'আউটবই' তথা পাঠ্যবই ছাড়া সজনশীল অন্যান্য বই রচনা, প্রকাশ, প্রচার ও বিতরণ ইত্যাদি যেসব সমস্যার বিস্তারিত আলোচনা তিনি করেছিলেন, অর্ধশতাব্দীর অধিক সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পরও সেসব সমস্যার যথার্থ সমাধান হয়েছে এমন দাবি আমরা এখনও করতে পারি না। সাহিত্য-সংস্কৃতির বিভিন্ন শাখায় অর্জন ও উত্তরণের পূর্ণাঙ্গ আলোচনা এই বইটির বিভিন্ন রচনায় স্থান পেয়েছে এবং আশাবাদী মনোভাব ব্যক্ত হয়েছে বলেই সঙ্কট কেটে যাওয়ার অবিচল বিশ্বাস ধ্বনিত হয়েছে তাঁর কণ্ঠে। শেষ রচনা 'চট্টগ্রাম জেলা লোক-সঙ্গীত সম্মেলন'-এর 'অভ্যর্থনা সমিতির সভাপতির অভিভাষণ' তিনি শেষ করেছেন এই বলে:
'অসতো মা সৎ গময়' 'অসৎ হইতে আমাদিগকে সতে লইয়া যাও' 'Light, more light' আলো আরো আলো'-ইহাই হউক আমাদের আগামী দিনের প্রার্থনা। (সঙ্কট কেটে যাচ্ছে, পৃ ১৪১)
আলোকাভিসারী মাহবুব-উল আলম স্বদেশের মাটির প্রতি ঈমানের যে অঙ্গীকার ব্যক্ত করেছিলেন তার প্রমাণ দিয়েছেন মুক্তিযুদ্ধকালে সত্তরোর্ধ্ব বয়সে রাইফেল হাতে হানাদার পাকিস্তানী সেনাদের প্রতিহত করার উদগ্র ইচ্ছা ব্যক্ত করে। স্বাধীনতা অর্জনের পর লিখেছেন বাঙ্গালীর মুক্তিযুদ্ধের ইতিবৃত্ত। এ ইতিহাস রচনার কারণ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেছেন:
'আমি রেকর্ড হিসেবে এই ইতিবৃত্ত রচনা করেছি। জাতির জীবনে এই রেকর্ডের প্রয়োজন রয়েছে। আমি যা পারলাম করলাম। আমার উনাশি বৎসর বয়স।...'
মাহবুব-উল আলম যে সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছিলেন, আমাদের কালে আজ তার রূপ, আকৃতি, আকার ও মাত্রিকতার পরিবর্তন ঘটেছে। প্রযুক্তির অভাবনীয় অগ্রগতি ও প্রসার, যোগাযোগ ব্যবস্থার অচিন্তনীয় সম্প্রসারণ, বিশ্ব-ইতিহাসের প্রেক্ষাপটে সমাজতন্ত্রী রাশিয়ার রাজনৈতিক বিপর্যয়-ফলে সাম্যবাদী রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্ভাবনা ও সাফল্য সম্পর্কে সংশয়-সৃষ্টি, আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের একাধিপত্যবাদী মনোভাব ও আগ্রাসী নীতি ইত্যাদির সম্মিলিত প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে আজ বিশ্বব্যাপী যে অসহিষ্ণু হিংসা-প্রতিহিংসার বাতাবরণ সৃষ্টি হয়েছে তা কেবল 'রাষ্ট্র-মন'কেই আচ্ছন্ন করেনি, বরং 'সমাজ-মন' ও 'ব্যক্তি-মনকেও সংশয়ের আবর্তে নিক্ষেপ করেছে। এর ফলে 'দূর' 'নিকট' হয়েছে বটে, কিন্তু 'পর' যে সত্যিকার অর্থে 'আপন' হয়েছে এমন দাবি খুব জোর দিয়ে করা যায় না। 'অর্থ অনর্থের মূল'-এই আপ্তবাক্য আজ পরিহাসের বস্তু। রাষ্ট্রের উন্নয়ন ও অনুন্নয়নের মাপকাঠি মুদ্রার সকঠিন নিগড়ে আবদ্ধ- যেন মানুষ তার জীবনযাপনে কতখানি স্বচ্ছন্দ ও স্বাবলম্বী হতে পারে, কল্যাণবোধ ও নৈতিকতাবোধে কতভাবে উজ্জীবিত হতে পারে-তা আমরা বিস্মৃত হতে চলেছি। অন্যদিকে 'বিনোদন সংস্কৃতি'র সর্বগ্রাসী তরঙ্গাঘাতে জীবনের গভীরতা ও উদারতা-বোধ বিপর্যস্ত, 'বণিক-বৃত্তি' আত্মসাৎ করতে উদ্যত 'চিত্তবৃত্তি'কে। একদিকে সম্ভাবনার অনিঃশেষ দিগন্ত, অন্যদিকে ভোগলিন্সার নিরন্তর আস্ফালন। সত্যিকার অর্থেই আজ আমাদের 'রাষ্ট্র-মন', 'সমাজ-মন' ও 'ব্যক্তি-মন' জটিল ও বহুমুখী সঙ্কটের সম্মুখীন। আবার এ কথাও সত্য যে, সঙ্কট অতিক্রমের শক্তিই মানুষের প্রকৃত জীবনীশক্তি। তাই সব সঙ্কটের মুখোমুখি দাঁড়ানোর জন্য আমাদের অবশ্যই 'নৈতিকতার বোধসম্পন্ন মানবিকতা ও আধুনিকতার' আবাহনে 'যথার্থই অনলস ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী' জীবনসংগ্রামী ও জীবনশিল্পী মাহবুব-উল-আলমের মতো অপরাজেয় মানুষদের স্মরণ ও অনুসরণ করতে হবে। শতবর্ষের শ্রদ্ধাঞ্জলির সার্থকতা এ ছাড়া পূর্ণ ও যথার্থ হবার নয়।
সহায়ক গ্রন্থ
১. মাহমুদ শাহ কোরেশী, মাহবুব-উল আলম, প্রথম প্রকাশ, ঢাকা, বাংলা একাডেমী, ১৯৮৮
২. মাহবুব-উল আলম, মো'মেনের জবানবন্দী, পঞ্চম মুদ্রণ, চট্টগ্রাম, প্রকাশক: বদরুল আলম, ১৯৫৩
৩. মাহবুব-উল আলম, সঙ্কট কেটে যাচ্ছে, প্রথম মুদ্রণ, চট্টগ্রাম, প্রকাশক: এম, আলম, ১৯৫৪ (?)
৪. মাহবুব-উল আলম, তাজিয়া, তৃতীয় মুদ্রণ, চট্টগ্রাম, নয়ালোক প্রকাশনী, ১৯৬৬
৫. মাহবুব-উল আলম, রক্ত-আগুন-অশ্রুজল-স্বাধীনতা, প্রথম প্রকাশ, চট্টগ্রাম, সপ্তডিঙ্গা, ১৯৭৪
৬. মাহবুব-উল আলম, মফিজন, শৈলী মুদ্রণ (৪র্থ-মুদ্রণ), চট্টগ্রাম, শৈলী প্রকাশন, ২০০১
৭. মাহবুব-উল আলম, প্রধান অতিথি ও তাজা শিঙ্গি মাছের ঝোল, প্রথম সংস্করণ, ঢাকা, সৃজন প্রকাশনী লিমিটেড, ১৯৮৯


